• ঢাকা
  • শুক্রবার, 2 October 2026, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: 8 September, 2026
সর্বশেষ আপডেট : 8 September, 2026

ইসলামি ব্যাংকিংয়ে শরিয়াহ পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন, মুরাবাহা চর্চা নিয়ে বিতর্ক

অনলাইন ডেস্ক

ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শরিয়াহ পরিপালন ও প্রকৃত বিনিয়োগের ঝুঁকি গ্রহণ নিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের নামে পরিচালিত বর্তমান ব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থে সুদমুক্ত অর্থায়ন হচ্ছে কি না।

আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হলো, ইসলামি ব্যাংকগুলো অর্থায়নের সময় নিজেদের বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করলেও গ্রাহকের ব্যবসায় লোকসান হলে তারা প্রকৃত অংশীদারের মতো ঝুঁকি নেয় কি না। তাঁর মতে, কাগজে-কলমে কেনাবেচার মাধ্যমে পরিচালিত কিছু লেনদেন বাস্তবে সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের ইসলামি ব্যাংকিংসংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার রায়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। ১৯৯১ সালে পাকিস্তানের ফেডারেল শরীয়ত আদালত সুদসংক্রান্ত বিভিন্ন বিধানকে শরিয়াহবিরোধী ঘোষণা করেন। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২২ সালের রায়ে পাকিস্তানের ফেডারেল শরীয়ত আদালত অর্থনীতি থেকে সুদ বা রিবা বিলোপের জন্য ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করেন।

ওই মামলার তিনটি পৃথক মতামতের একটি দেন প্রখ্যাত শরিয়াহ বিশেষজ্ঞ বিচারপতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিস্তারকে তিনি এটিকে নিছক তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং বাস্তবায়নে প্রচলিত চর্চার দুর্বলতাও তিনি তুলে ধরেন।

বিশেষ করে মুরাবাহা পদ্ধতির অতিরিক্ত ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেন বিচারপতি উসমানী। মুরাবাহায় ব্যাংক গ্রাহকের প্রয়োজনীয় পণ্য প্রথমে কিনে মালিকানা ও দখল গ্রহণ করে, পরে নির্ধারিত মুনাফা যোগ করে তা গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। তাঁর মতে, বৈধ মুরাবাহার জন্য পণ্যের প্রকৃত অস্তিত্ব, ব্যাংকের মালিকানা ও দখল এবং দখলে থাকা অবস্থায় ঝুঁকি বহনের শর্ত পূরণ করতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে এসব শর্ত যথাযথভাবে মানা না হলে মুরাবাহা সুদভিত্তিক ঋণের বিকল্প নাম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিচারপতি উসমানীও এ ধরনের চর্চাকে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল উদ্দেশ্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন।

বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংকিং খাতেও মুরাবাহা ও অন্যান্য দায়ভিত্তিক অর্থায়নের ওপর অতিনির্ভরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংকে বিনিয়োগের নামে অর্থ সরিয়ে নেওয়া এবং লেনদেনে প্রকৃত পণ্য ও মালিকানার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ খাতটির সুশাসন ও শরিয়াহ পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে।

তবে মুরাবাহা ও মুশারাকার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মুশারাকায় অংশীদাররা মূলধনের অনুপাতে ব্যবসায়িক লোকসানের ঝুঁকি বহন করেন। অন্যদিকে মুরাবাহায় ব্যাংক অংশীদার নয়, বিক্রেতা। ফলে গ্রাহকের ব্যবসায়িক লোকসানের দায় ব্যাংকের ওপর পড়ে না; তবে পণ্য গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত পণ্যের মালিকানা ও ঝুঁকি ব্যাংকের বহন করার কথা।

এ কারণে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল চ্যালেঞ্জ শুধু মুনাফা নেওয়া নয়, বরং সেই মুনাফা অর্জনের পদ্ধতিতে শরিয়াহর শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা। আইনমন্ত্রীর মন্তব্যকে তাই ইসলামি ব্যাংকিংয়ের বিরোধিতা হিসেবে না দেখে এ খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শরিয়াহ পরিপালন আরও কঠোর করার দাবি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন

  • অর্থনীতি এর আরও খবর